?> দূষণের কারণে কীভাবে কমে যাচ্ছে পুরুষদের শুক্রাণুর মান | AAA News । বাংলাদেশসহ বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, শিরোনাম, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ, খেলা, বিনোদন, চাকরি, রাজনীতি ও বাণিজ্যের বাংলা নিউজ পড়তে ভিজিট করুন। AAA News । বাংলাদেশসহ বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, শিরোনাম, প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ, খেলা, বিনোদন, চাকরি, রাজনীতি ও বাণিজ্যের বাংলা নিউজ পড়তে ভিজিট করুন।
শেয়ার বাজার

দূষণের কারণে কীভাবে কমে যাচ্ছে পুরুষদের শুক্রাণুর মান

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: শনিবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৩

দূষণের কারণে কীভাবে কমে যাচ্ছে পুরুষদের শুক্রাণুর মান

সারা বিশ্বেই পুরুষদের বীর্যে শুক্রাণুর মান কমে যাচ্ছে। কিন্তু দম্পতিদের সন্তান না হবার পেছনে এটি এমন একটি কারণ - যা নিয়ে আলোচনা হয় খুবই কম। তবে পুরুষদের এ সমস্যা ঠিক কেন হয় – তা এখন বিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করতে শুরু করেছেন।

“আপনার সমস্যাটা সমাধান করা যাবে। চিন্তা করবেন না, আপনাকে আমরা সাহায্য করতে পারবো” – জেনিফার হ্যানিংটনকে বললেন ডাক্তার। “কিন্তু আপনি” – জেনিফারের স্বামী কিয়ারানের দিকে ফিরে বললেন তিনি –“আপনার জন্য আমরা খুব বেশি কিছু করতে পারবো না।“

ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের বাসিন্দা এই দম্পতি দু বছরের বেশি সময় ধরে সন্তান নেবার চেষ্টা করছেন।

তারা জানতেন, এটা কঠিন হবে কারণ জেনিফারের ‘পলিসিস্টিক ওভেরিয়ান সিনড্রোম’ নামে একটি সমস্যা আছে যা তার উর্বরতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

কিন্তু তারা যার জন্য তৈরি ছিলেন না তা হলো – কিয়ারানেরও একটি সমস্যা আছে।

পরীক্ষায় দেখা গেল, কিয়ারানের বীর্যে শুক্রাণুর সংখ্যা কম, এবং যা আছে সেগুলোরও নড়াচড়া করার ক্ষমতা কম।

আরো খারাপ খবর হলো, এর চিকিৎসা করা জেনিফারের সমস্যাটার চাইতেও কঠিন , হয়তো অসম্ভব।

হ্যানিংটনের এখনো মনে আছে একথা শোনার পর তার স্বামীর প্রতিক্রিয়ার কথা।

“সে স্তম্ভিত, শোকাহত হয়ে পড়লো। আমি কিছুতেই ব্যাপারটা মানতে পারছিলাম না। আমার মনে হচ্ছিল, ডাক্তারই ভুল করেছে।“

মানসিক বিপর্যয়

কিয়ারান সবসময়ই চাইতেন সন্তানের পিতা হতে। “আমার মনে হলো আমিই আমার স্ত্রীকে ডুবিয়েছি“ – বললেন তিনি।

পরের কয়েক বছরে কিয়ারানের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হতে লাগলো। তিনি একা একা অনেক বেশি সময় কাটাতে শুরু করলেন।

তিনি বিছানায় শুয়ে থাকতেন। শান্তি খুঁজতে শুরু করলেন এ্যালকোহলের মধ্যে।

তার পর একসময় শুরু হলো ‘প্যানিক অ্যাটাক’ হওয়া – যার লক্ষণ হঠাৎ শরীর কাঁপতে থাকা, বুক ধড়ফড় করা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, ঘাম হওয়া, মাথা ঘোরানো ।

“সেটা ছিল এক গভীর সংকটকাল, মনে হলো আমি যেন একটা অন্ধকার গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি” বলছিলেন কিয়ারান।

পুরুষের অনুর্বরতা নিয়ে কেউ কথা বলতে চান না

দম্পতিদের সন্তান না হওয়ার যত ঘটনা ঘটে – তার প্রায় অর্ধেকই ঘটে পুরুষের অনুর্বরতার কারণে।

কিন্তু নারীদের অনুর্বরতা নিয়ে যত আলোচনা হয়, তার তুলনায় পুরুষদের অনুর্বরতা নিয়ে আলোচনা হয় খুবই কম।

এর একটা কারণ হলো এ সমস্যাটিকে ঘিরে নানারকম সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রশ্ন আছে – যেন এটা নিয়ে কথা বলাই বারণ।

যেসব পুরুষদের উর্বরতার সমস্যা আছে তাদের অধিকাংশের ক্ষেত্রেই এর কারণ কি তার কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।

তার ওপর যেহেতু পুরুষদের অনুর্বরতা নিয়ে সমাজে নেতিবাচক ধারণা আছে, তাই অনেককে এ জন্য এক নিরব মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে হয়।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে এ সমস্যা সম্ভবত বাড়ছে।

এতে দেখা যায়, দূষণসহ বিভিন্ন কারণ পুরুষের উর্বরতার ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় বীর্যে শুক্রাণুর মানের ওপর ।

স্বভাবতই ব্যক্তি স্তরে এবং পুরো সমাজের জন্যই এর পরিণাম অত্যন্ত ব্যাপক।

এক গোপন 'উর্বরতা সংকট?'

গত এক শতাব্দীতে সারা বিশ্বে জনসংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে।

মাত্র ৭০ বছর আগেও পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ২৫০ কোটি। কিন্তু ২০২২ সালে পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৮০০ কোটি।

তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এখন কমে আসছে – যার পেছনে প্রধান কারণগুলো সামাজিক ও অর্থনৈতিক।

সারা বিশ্ব জুড়ে শিশু জন্মের হার রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। পৃথিবীর ৫০ শতাংশ মানুষই এখন এমন দেশগুলোতে বাস করে যেখানে উর্বরতার হার নারীপ্রতি দুটি শিশুরও নিচে। এর ফলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংখ্যাই এক সময় কমে আসবে – যদি অভিবাসন না হয়।

জন্মহার কমার কিছু কারণ আছে যা ইতিবাচক। যেমন নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ এখন অনেক বেড়েছে।

অন্যদিকে, নিম্ন উর্বরতার হারের কিছু দেশ আছে যেগুলোতে অনেক দম্পতিই তাদের যতগুলো সন্তান আছে তার চেয়ে বেশি নিতে চান- কিন্তু সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে পারেন না।

এরই পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে আরো কতগুলো কারণ। একজন ব্যক্তির সন্তান জন্মদানের শারীরিক সক্ষমতাকে বলা হয় ফিকান্ডিটি – যাকে বলা যায়, উর্বরতাকে একটা ভিন্ন মাপকাঠিতে দেখা। এখন, মনে করা হচ্ছে যে এই ফিকান্ডিটির হার বর্তমানে হয়তো কমে যাচ্ছে।

কিছু গবেষণায় আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে বিশেষ করে পুরুষদের মধ্যে প্রজনন-সংক্রান্ত সমস্যার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।

এর মধ্যে আছে বীর্যে শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া, দেহে টেস্টোস্টেরন নামে হর্মোনের মাত্রা কমে যাওয়া, পুরুষাঙ্গের উত্থানজনিত সমস্যা বেড়ে যাওয়া, এবং অন্ডকোষের ক্যান্সার।

সাঁতার-কাটা দেহকোষ

“শুক্রাণু একটি চমকপ্রদ দেহকোষ” – বলছিলেন ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ সারাহ মার্টিন ডা সিলভা – “তারা অতি ক্ষুদ্র, কিন্তু তারা সাঁতরাতে পারে, তারা শরীরের বাইরে বেঁচে থাকতে পারে। আর কোন দেহকোষেরই এ ক্ষমতা নেই, তারা অনন্য সব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।“

এখন মনে করা হচ্ছে - খুব সামান্য কিছু পরিবর্তনও এই অনন্য বৈশিষ্ট্যধারী কোষগুলোর ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে জোরালো প্রভাব পড়তে পারে তাদের ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করার ক্ষমতার ওপর। “

উর্বরতার জন্য যে জিনিসটি বিশেষ জরুরি তা হলো শুক্রাণুর সচলতা, তাদের আকার ও আকৃতি, এবং একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ বীর্যের মধ্যে তাদের সংখ্যা কত – যাকে বলে ‘স্পার্ম কাউন্ট।‘

পুরুষদের উর্বরতা পরীক্ষার সময় এগুলো যাচাই করে দেখা সম্ভব।

“সাধারণত প্রতি মিলিলিটার বীর্যের মধ্যে শুক্রাণুর সংখ্যা যদি চার কোটির কম থাকে – তখনই উর্বরতার সমস্যা দেখা যেতে থাকে” – বলছিলেন হাজাই লেভিন, যিনি জেরুসালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

তিনি ব্যাখ্যা করছেন যে স্পার্ম কাউন্টের সাথে উর্বরতার সম্ভাবনার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে।

স্পার্ম কাউন্ট বেশি হলেই যে গর্ভধারণ হবার সম্ভাবনা বেশি হবে তা বলা যায় না – কিন্তু শুক্রাণুর সংখ্যা মিলিলিটারপ্রতি ৪০ মিলিয়নের নিচে নেমে গেলেই গর্ভধারণের সম্ভাবনা অনেক খানি কমে যায়।

অধ্যাপক লেভিন এবং তার সহযোগীরা ২০২২ সালে পৃথিবীব্যাপি স্পার্ম কাউন্টের নিম্নমুখী প্রবণতা নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিলেন।

এতে দেখা যাচ্ছে, ১৯৭৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে স্পার্ম কাউন্ট গড়ে ১.২% কমে গিয়ে মিলিলিটারপ্রতি ১০৪ থেকে ৪৯-এ নেমে এসেছে।

এর মধ্যে ২০০০ সাল থেকে শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়ার হার বেড়ে বছর প্রতি ২.৬%এ উঠেছে।

লেভিন যুক্তি দিচ্ছেন যে এই অধোগতির সাথে হয়তো ‘এপিজেনেটিক্স’ বা মানব জিন যেভাবে কাজ করে তার সম্পর্ক থাকতে পারে – যা সম্ভবত পরিবেশগত বা জীবনযাপন-সংক্রান্ত বিভিন্ন কারণে ঘটছে।

অন্য আরেকটি গবেষণাতেও আভাস পাওয়া গেছে যে শুক্রাণুতে পরিবর্তন বা পুরুষের অনুর্বরতার পেছনে এপিজেনেটিক্সের ভূমিকা থাকতে পারে।

“এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে হয়তো এ সমস্যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পরিবাহিত হচ্ছে” – বলেন লেভিন।

সবাই এ তত্ত্বের সাথে একমত নন

এই এপিজেনেটিক পরিবর্তনের তত্ত্ব অবশ্য বিতর্কও সৃষ্টি করেছে এবং সবাই এর সাথে একমত নন।

তবে এমন তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে যাতে মনে হয়, এটা হলেও হতে পারে।

“এ ব্যাপারটা (শুক্রাণুর সংখ্যা কমতে থাকা) হচ্ছে পুরুষদের নিম্নগামী স্বাস্থ্যের একটা চিহ্ন – হয়তো গোটা মানবজাতির ক্ষেত্রেই তা ঘটছে” – বলছেন লেভিন – “হয়তো আমরা একটা জনস্বাস্থ্য সংকটের সম্মুখীন, যা ঠেকানো সম্ভব কিনা তা আমরা এখনো জানি না।“

গবেষণা থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে মানুষের জীবনযাপনের কিছু উপাদান হয়তো অনুর্বরতা এবং অন্য আরো কিছু স্বাস্থ্য সমস্যার পেছনে ভূমিকা রাখছে।

এমনও হতে পারে যে শুক্রাণুর মানের এ অবনতি হয়তো ব্যক্তিগতভাবে জীবনযাপনে পরিবর্তন এনেও ঠেকানো সম্ভব নয়।

গবেষণা থেকে ক্রমশই এমন আরো বেশি প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে এক্ষেত্রে একটি ব্যাপকতর পরিবেশগত হুমকি রয়েছে, আর তা হলো – দূষণ সৃষ্টিকারী নানা ক্ষতিকর পদার্থ।

দূষণ ঘটাচ্ছে প্লাস্টিক এবং অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ

মানুষের ঘরের ভেতরে ব্যবহৃত হয় এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থ পুরুষের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলছে – তা নিয়ে গবেষণা করছেন যুক্তরাজ্যের নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেবেকা ব্ল্যানচার্ড ।

এই প্রভাব বোঝার জন্য তিনি কাজে লাগাচ্ছেন গৃহপালিত কুকুরকে। কারণ, গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে সেই কুকুর একই বাড়িতে থাকছে এবং একই দূষণকারী রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে আসছে।

রেবেকা গবেষণা করছেন প্লাস্টিক, আগুনরোধী রাসায়নিক, এবং ঘরের অন্যান্য নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী নিয়ে।

এসব রাসায়নিক পদার্থের কিছু কিছু নিষিদ্ধ, কিন্তু পরিবেশে এবং পুরোনো জিনিসপত্রের মধ্যে তার অবশেষ রয়ে গেছে।

তার গবেষণায় দেখা গেছে, এসব রাসায়নিক পদার্থ আমাদের হর্মোন সিস্টেমকে বিঘ্নিত করতে পারে এবং মানুষ ও কুকুর উভয়ের ক্ষেত্রেই উর্বরতা কমিয়ে দিতে পারে।

রেবেকা ব্ল্যানচার্ড বলছেন, “আমরা মানুষ এবং কুকুর উভয়েরই শুক্রাণুর নড়াচড়ার ক্ষমতা কমে যাওয়ার তথ্য পেয়েছি । তা ছাড়া তার ডিএনএ ভেঙে যাওয়ার পরিমাণও বেড়ে যেতে দেখেছি।“

ডিএনএ ভেঙে যাওয়া বলতে তিনি বোঝাচ্ছেন, যেসব জিনগত সামগ্রী দিয়ে শুক্রাণু তৈরি - তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা ভেঙে যাওয়া।

এর ফলে গর্ভধারণের পরও নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।

রেবেকা ব্ল্যানচার্ড বলছেন, ডিএনএ ভেঙে যাওয়ার পরিমাণ যদি বেড়ে যায় তাহলে গর্ভধারণের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যে ‘মিসক্যারেজ’ বা ভ্রুণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনাও বেড়ে যায়।

তার এই তথ্যের সাথে অন্যান্য গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যের মিল আছে। ওই গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে যে প্লাস্টিক, সাধারণ নানা ওষুধ, খাদ্য এবং বাতাসে উপস্থিত রাসায়নিক পদার্থ উর্বরতার ক্ষতি ঘটাতে পারে।

এগুলো শুধু পুরুষ নয়, নারী ও শিশুদের দেহেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

কার্বন এবং কখনোই নষ্ট হয় না এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থের অস্তিত্ব এমনকি গর্ভস্থ শিশুর দেহেও পাওয়া গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনও পুরুষের উর্বরতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বেশ কিছু প্রাণীর ওপর চালানো জরিপে আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি বিশেষ করে শুক্রাণুর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

দেখা গিয়েছে যে তাপপ্রবাহ কীটপতঙ্গ ও মানুষের শুক্রাণুর ক্ষতি করে।

২০২২ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে গরম পরিবেশে বা উচ্চ তাপমাত্রায় কাজ করলে শুক্রাণুর মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

নিম্নমানের খাদ্য, মানসিক চাপ ও এ্যালকোহল

পরিবেশগত নানা কারণের পাশপাশি ব্যক্তিগত নানা সমস্যাও পুরুষদের উর্বরতা কমিয়ে দিতে পারে। যেমন - নিম্নমানের খাদ্য, দীর্ঘ সময় ধরে বসে থাকতে হয় এমন জীবনযাপন, মানসিক চাপ, এ্যালকোহল পান এবং মাদক ব্যবহার ।

বর্তমানে অনেক দম্পতিই অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সে সন্তানের পিতামাতা হচ্ছেন।

তবে নারীদেরকে তাদের “জীবনের সবচেয়ে উর্বর সময়কাল“ বা “বায়োলজিকাল ক্লকের” কথা যতটা মনে করিযে দেয়া হয়, তার বিপরীতে ‘পুরুষদের উর্বরতার ক্ষেত্রে বয়স কোন ব্যাপার নয়’ - এমনটাই আগে মনে করা হতো।

কিন্তু সেই ধারণার এখন পরিবর্তন হচ্ছে।

বেশি বয়সে পিতামাতা হবার ক্ষেত্রে শুক্রাণুর সংখ্যা এবং উর্বরতা কমে যাবার সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে।

এখন বলা হচ্ছে যে পুরুষদের অনুর্বরতাকে আরো ভালোভাবে বুঝতে হবে এবং এ সমস্যা নিরুপণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গী দরকার।

একই সাথে দূষণ রোধের জরুরি প্রয়োজনের ব্যাপারে সচেতন হতেও বলা হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, শুক্রাণুর মান বৃদ্ধির জন্য পুরুষরা ব্যক্তিগতভাবে কী কী করতে পারেন?

রেবেকা ব্ল্যানচার্ড বলছেন, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার এবং ব্যায়াম দিয়ে শুরু করাটা ভালো, কারণ এর সাথে শুক্রাণুর মান উন্নত হবার সম্পর্ক দেখা গেছে।

তিনি আরো বলছেন অরগ্যানিক খাবার খাওয়া এবং বাইফেনল-এ বা বিপিএ-বিহীন প্লাস্টিক ব্যবহার করার কথা। এই বিপিএর সাথে নারী ও পুরুষ উভয়েরই অনুর্বরতার সম্পর্ক আছে।

“এরকম ছোট ছোট কিছু পন্থা আপনি নিতে পারেন” – বলছেন রেবেকা ব্ল্যানচার্ড।

হ্যানিংটন দম্পতি শেষ পর্যন্ত আইভিএফ পদ্ধতিতে দুটি সন্তানের বাবা-মা হয়েছেন।

“আমি প্রতিদিনই আমার সন্তান দুটির জন্য কৃতজ্ঞতা বোধ করি” বলছেন কিয়ারান হ্যানিংটন - “কিন্তু অতীত দিনগুলোর কথা আমি ভুলিনি, কখনোই তা সম্ভব নয়।“

হাম
হাম: আরও ১০ শিশুর মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ মে, ২০২৬

হাম: আরও ১০ শিশুর মৃত্যু

দেশে হামের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম এবং এর উপসর্গ নিয়ে আরও ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৭৩২ জন।

আজ শুক্রবার (২৯ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে আজ শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে দুজন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আটজন মারা গেছে। সব মিলিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মোট ৯০ জনের মৃত্যু হলো। এছাড়া একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে আরও ৪৮৫ জন শিশু।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬৭৪ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং ল্যাব টেস্টে নিশ্চিত হওয়া গেছে আরও ৫৮ জনের দেহে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে চলতি সময় পর্যন্ত দেশে মোট সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৮ হাজার ৫৭৯ জনে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৯৪৩ জনের শরীরে হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।


স্কুল ফিডিং প্রকল্পে ‘সাগর চুরি’, সপ্তাহে কলা-ডিমেই লোপাট ১৭ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮ মে, ২০২৬

স্কুল ফিডিং প্রকল্পে ‘সাগর চুরি’, সপ্তাহে কলা-ডিমেই লোপাট ১৭ কোটি টাকা

সারাদেশে প্রায় ১৫০ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক স্কুল ফিডিং প্রকল্পটি চলছে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর থেকে। প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে বর্তমানে ৫ প্রকার খাবার দেওয়া হচ্ছে শিশুদের। তালিকায় রয়েছে, ডিম, বানরুটি, দুধ, কলা ও বিস্কুট। তবে অভিযোগ উঠেছে এই প্রকল্পে শিশুদের নিম্নমানের খাবার দেওয়া হচ্ছে। ১১ উপজেলায় যমুনা টেলিভিশনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সপ্তাহে কলা ও ডিম-বানরুটি থেকেই লোপাট হচ্ছে ১৭ কোটি টাকা। নিম্নমানের এসব খাবার খেয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা।

স্কুল ফিডিং প্রকল্পের খাবার খেয়ে দুই দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল শিশু রাইসা মুনতাহা। সে জানায়, তার পেট ব্যথা করছিল। এছাড়াও তার ভাষ্যমতে, ওসব খাবার সব কেমিক্যাল।

রাইসার মিডডে মিল খাবারের ভয় এখনও কাটেনি। তেমনি তার মা জান্নাতুল সন্তানকে নিয়ে শঙ্কিত। তিনি বলেন, বিষাক্ত খাবার দিয়ে আমার লাভ কী? লাভ নেই। আর বাচ্চাদের যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে কী করবো? কে দেবে আমাকে বাচ্চা?

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার থুপশাড়ের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবারে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, মিডডে মিলের বানরুটিতে ফাঙ্গাস জমেছে। এর ফলে খাবার থেকে গন্ধ বের হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জিয়াউল হক জানান, এমন ঘটনা নিয়মিতই ঘটে। আজ পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

একই চিত্র দেখা যায়, জেলার কালাই উপজেলার তেলিহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও। বিদ্যালয়টির শিক্ষক জানান, এই রুটি খেলে পেটে ব্যথা হবে।

১২০ গ্রাম ওজনের বান রুটির দাম ধরা হয়েছে ২৪ টাকা পর্যন্ত। এমনকি ওজন ঠিক রাখতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছে রুটি।

আশেপাশের আরও কয়েকটি জেলা ঘুরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রুটির ভেতরের বাতাস থেকে এক ধরনের দুর্গন্ধ বের হয়, যা খাওয়ার অযোগ্য করে তোলে। তাই শিশুরা অনেক সময়ই সেটা ফেলে দেয়।

তবে নিয়ম অনুযায়ী ডিম দিতে হবে ন্যূনতম ৬০ গ্রাম ওজনের। প্রতি পিসের দাম ১৪ টাকা পর্যন্ত। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একেকটি ডিমের ওজন ৩৫ কিংবা ৪০ গ্রামের বেশি নয়।

৬০ গ্রাম না দিয়ে কম ওজনের ডিম দেওয়া হচ্ছে, জানতে পাবনার একটি খামারে গেলে একজন জানান, ছোট ডিমে এক টাকা কম লাগে। তিনি আরও জানান, ৫৫ গ্রামের ডিমগুলো বড় ক্যাটাগরিতে পড়ে, দামও বেশি।

এসব কারণেই প্রতিদিন ২৯ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫০ জন শিক্ষার্থীর বাজেটে এক টাকা কম করেও দেওয়া হলে সারা বাংলাদেশে প্রতিদিন নিয়মবহির্ভূতভাবে কর্মকর্তাদের পকেটে ঢুকবে লাখ টাকা, সপ্তাহে কোটি টাকা।

শুধু কম ওজন আর দামে সস্তা নয়, ঠিকঠাক সিদ্ধ না করা আর পচা ডিম সরবরাহের অভিযোগও আছে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্যমতে, এই ডিম খাওয়া যায় না, তেমনি পচাও থাকে।

এদিকে, শিক্ষার্থীরা জানায়, কলার মাঝের অংশ অনেক সময় খারাপ থাকে। এ বিষয়ে এক শিক্ষক বলেন, অভিভাবকরা অভিযোগ করছেন, এই কলা যদি খাওয়ানো হয়, তাহলে আগে বাচ্চার কাশির ওষুধ কিনে দিতে হবে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা এসব কলা খেতে পারছে না। তাদের ভাষ্যমতে, কলা শক্ত, এটি না পাকায় তাদের কাছে কস লাগে।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের গিয়ে এক স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, কলার ওজন ৯০ গ্রাম। তবে সেখানে ১০০ গ্রাম ওজনের কলা দেওয়ার কথা ছিল সরবরাহকারীদের। চুক্তি অনুযায়ী ১০০ গ্রাম ওজনের প্রতিটি কলার দাম সাড়ে ১০ টাকা পর্যন্ত।

দাম যাচাইয়ে উত্তরাঞ্চলের কলার অন্যতম হাট দুর্গাদহ বাজারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একেকটি কলার দাম পড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ টাকা। এমনকি ওজনভেদেও দামের তারতম্য দেখা যায়।

কলার বাজেটে শিক্ষার্থীর জন্য প্রতি কলায় ৭ টাকা বরাদ্দ থাকলে, সেই হিসাবে প্রতি সপ্তাহে অসাধু কর্মকর্তাদের পকেটে প্রায় দুই কোটি টাকা ঢুকছে।

এসব নিম্নমানের কলা, রুটি, ডিম খেয়ে বিভিন্ন স্থানে অসুস্থ হয়েছেন তিন শতাধিক শিক্ষার্থী। তবে সবচেয়ে বেশি অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে।

গত ২২ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শঙ্করবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়েন ২০ জন শিক্ষার্থী। তারা জানান, পাউরুটি খেয়ে পেট ব্যথা এবং বমি হয়েছিল।

শুধু রাজশাহী বিভাগের ১২ উপজেলায় পৌনে দুই লাখ শিক্ষার্থীর জন্য কলা, রুটি, ডিম সরবরাহ করে গণউন্নয়ন সংস্থা গাক। একজন বলেন, গণনায় ধরলে ২২ হাজার ডিম আসে। এত ডিম কি চেক করে দেওয়া সম্ভব?

প্রকল্প পরিচালক বলেন, ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অ্যাকশন আমাদের নিতে হবে। কারণ আসলে কোমলমতি বাচ্চাদের এই খাবারের বিষয়ে আমরা কোনো প্রকার ছাড় দিতে রাজি নই।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, উপাদানগুলো যদি ক্ষতিকর হয়, তাহলে তা শিশুদের লিভারের ক্ষতির কারণ হতে পারে। আর যদি তা বাসি বা পচা হয়, তবে ডায়রিয়া, জন্ডিস, হেপাটাইটিস-এ ও ই হতে পারে।

সার্বিক বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনকে অবহিত করলে তিনি বলেন, এখন থেকে প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজমেন্ট কমিটি খাবার কমিটিতে থাকবে, তারা বিষয়টি বুঝে নেবে, এমনই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, স্কুল ফিডিং প্রকল্পে আগামীতে দেশের সরকারি সব প্রাথমিকে খাবার দিতে ১২ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে চায় সরকার।


পাকস্থলী-পিত্তথলির ক্যান্সার বেশি তরুণী ও মধ্যবয়সী নারীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭ জুন, ২০২৩

পাকস্থলী-পিত্তথলির ক্যান্সার বেশি তরুণী ও মধ্যবয়সী নারীদের

দেশের মানুষের মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণ ক্যান্সার। বছরে এক লাখেরও বেশি মানুষ এ রোগে মারা যায়। দেহের স্থানভেদে কর্কট রোগ হয় বিভিন্ন প্রকার। আবার এক ক্যান্সারেরই রয়েছে অনেক ধরন। এর মধ্যে তরুণী এবং মধ্যবয়সী নারী ও পুরুষের মাঝে পাকস্থলী ও পিত্তথলির ক্যান্সারে আক্রান্তের হার প্রতিনিয়তই বাড়ছে। বিশেষ করে এ বয়সী নারীর মধ্যে এর আক্রান্ত ও মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচারের পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি এ রোগ বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি) গত মার্চে ‘হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস অ্যান্ড রিলেটেড ডিজিজেস রিপোর্ট’ শিরোনামে এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। তাতে বাংলাদেশের সব বয়সী নারী-পুরুষের ৩৩টি ক্যান্সারের বিভাজন দেখিয়েছে সংস্থাটি। এর মধ্যে ১৫-৪৪ বছর বয়সী নারীর মধ্যে পাকস্থলী ও পিত্তথলির ক্যান্সারে আক্রান্তের হার বেশি। এ রোগে তাদের মৃত্যুও বেশি হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। 

আইএআরসি বলছে, ১৫-৪৪ বছর বয়সী প্রতি এক লাখ নারীর মধ্যে ২ দশমিক ৬৭ জন পিত্তথলির ক্যান্সারে ভোগে, যেখানে পুরুষের আক্রান্তের হার শূন্য দশমিক ৪৭। একইভাবে প্রতি লাখে মৃত্যু হচ্ছে ২ দশমিক শূন্য ৮ নারীর ও শূন্য দশমিক ৩৭ পুরুষের। পাকস্থলীর ক্যান্সারেও এ বয়সী নারীর আক্রান্তের হার পুরুষের চেয়ে বেশি। প্রতি লাখে ১ দশমিক ৩৭ পুরুষ এ রোগে ভুগলেও নারী আক্রান্ত হচ্ছে ১ দশমিক ৫৭ জন। একইভাবে প্রতি লাখে শূন্য দশমিক ৮৩ জন পুরুষের বিপরীতে মৃত্যু হচ্ছে ১ দশমিক ১৩ নারীর। 

যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) বলছে, পাকস্থলীর যেকোনো অংশে ক্যান্সার পাওয়া যেতে পারে। তবে এটি কতটা গুরুতর তা নির্ভর করে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে কিনা তার ওপর। পিত্তথলির ক্যান্সারও খাদ্যের পরিপাকে বিশেষ ভূমিকা রাখা এ অঙ্গের যেকোনো অংশে পাওয়া যেতে পারে। 

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিআরএইচ) ক্যান্সার রোগতত্ত্বের সাবেক অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাকস্থলীর ক্যান্সার হওয়ার পেছনে বেশকিছু কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, খাওয়াদাওয়ার ব্যাপার আছে। খুব স্পাইসি খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। অ্যাসিডিটির সঙ্গে সম্পর্ক আছে। হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি বা এইচ পাইলোরি ব্যাকটেরিয়ায় সৃষ্ট সংক্রমণের কারণে পাকস্থলীর ক্যান্সার হতে পারে। তারপর অ্যালকোহলের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। অনেক সময় গলব্লাডারে স্টোন (পিত্তথলিতে পাথর) হয়, সেটা থেকেও সংক্রমণ হয়। নারীদের ক্যান্সারের সঙ্গে জীবনাচার ও খাদ্যাভ্যাসের সম্পর্ক রয়েছে।’

সব বয়সী নারী ও পুরুষের মধ্যে ক্যান্সার বিভাজনের ক্ষেত্রে আইএআরসি বলেছে, নারীর মধ্যে স্তন ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি। প্রতি লাখে ১৬ জন এ ক্যান্সারে আক্রান্ত। এর পরে রয়েছে জরায়ুমুখের ক্যান্সার। এতে প্রতি লাখে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ জনেরও বেশি। খাদ্যনালীর ক্যান্সারে ৯ দশমিক ৩৪, পিত্তথলির ক্যান্সারে ৬ দশমিক ৫৫ এবং ঠোঁট ও মুখগহ্বরের ক্যান্সারে প্রতি লাখে ৫ দশমিক ৬৮ জন আক্রান্ত হচ্ছে। অন্যদিকে পুরুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্যান্সার হচ্ছে খাদ্যনালীর, প্রতি লাখে ১৭ জন। এরপর ফুসফুসের ক্যান্সার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এতে আক্রান্ত হচ্ছে ১১ দশমিক ৮ জন। তৃতীয় অবস্থানে ঠোঁট ও মুখগহ্বরের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে ১১ জন পুরুষ। 

বাসি খাবার গ্রহণ পাকস্থলী ক্যান্সারের গুরুত্বপূর্ণ কারণ জানিয়ে এনআইসিআরএইচের ক্যান্সার ডায়াগনস্টিকের সাবেক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘শুঁটকি ও অতিরিক্ত লবণ পাকস্থলীর ক্যান্সারের অন্যতম কারণ। পিত্তথলিতে পাথর হলে সেখান থেকে ক্যান্সার হয়। এছাড়া খাদ্যে ভেজালেও এ ক্যান্সারগুলো হতে পারে। ঝাল, লবণ ও সংক্রমণের কারণে এসব ক্যান্সার প্রভাবিত হতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই মেয়েদের ক্ষেত্রে গলব্লাডারে ক্যান্সার বেশি হয়।’

বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে কোনো ক্যান্সার রেজিস্ট্রি নেই। বছরে সারা দেশে কত রোগী এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে বা মারা গেছে এমন হিসাব সরকারের কাছে নেই। তবে গ্লোবাল ক্যান্সার ইনসিডেন্স, মর্টালিটি অ্যান্ড প্রিভিলেন্স (গ্লোবোক্যান) পরিসংখ্যানের আলোকে আইএআরসি একটি হিসাব করেছে। তারা জানিয়েছে, বাংলাদেশে গত পাঁচ বছরে শনাক্তকৃত রোগীর মধ্যে এখনো ক্যান্সারে আক্রান্ত রয়েছে ২ লাখ ৭১ হাজারের কাছাকাছি। এর মধ্যে ২০২০ সালে শনাক্ত হয়েছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৭৫ জন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার ক্যান্সার রোগীর।

বিশেষজ্ঞরা যদিও বলছেন, দেশে বছরে তিন-চার লাখের মতো মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। মারা যাচ্ছে দেড় লাখ। কোথাও এ হিসাব তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। প্রাক্কলিত রোগীর সংখ্যার চেয়ে কয়েক গুণ ক্যান্সার রোগী বছরে রোগ শনাক্তের বাইরে থেকে যায়। দেশে বিশেষায়িত পর্যায়ের (টারশিয়ারি) সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসার কমবেশি সুবিধা রয়েছে। তবে সরকারিভাবে একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল এনআইসিআরএইচ। সারা দেশের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার রোগীরাই চিকিৎসার জন্য দেশের সর্বোচ্চ এ হাসপাতালে আসে। তাদের তথ্যে তৈরি রেজিস্ট্রি দেশের ক্যান্সার রোগীর হিসাবের প্রতিনিধিত্ব করে। 

হাসপাতালটির ক্যান্সার রোগতত্ত্ব (ক্যান্সার এপিডেমিওলজি) বিভাগ সম্প্রতি ‘ক্যান্সার রেজিস্ট্রি রিপোর্ট: ২০১৮-২০’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ৮৩ হাজারের কিছু বেশি রোগী চিকিৎসার জন্য বহির্বিভাগে এসেছিল। এর মধ্যে সাড়ে ৩৫ হাজারের ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছে। দেশে সাধারণভাবে পুরুষের চেয়ে নারী ক্যান্সার রোগীদের হার বেশি। এ তিন বছরেও হাসপাতালটিতে ক্যান্সার শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে নারীর হার ছিল ৫৫ শতাংশ।

শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রত্যেকটা ক্যান্সারের জেনেটিক (বংশগতি) প্রবণতা থাকে, সেই প্রবণতা জাতিতে জাতিতে বিভিন্ন রকম হয়। জেনেটিক কারণে বিভিন্ন জাতি এবং এমনকি এক জাতির বিভিন্ন ব্যক্তি বা বংশের মধ্যেও অনেক সময় জেন্ডারের প্রবণতা ভিন্ন হয়। এখন জেন্ডারের প্রবণতা থেকে জিনের যে প্রবণতা অনেক যুগ থেকে, অনেক জেনারেশন থেকেই হয় তো ছিল। রোগটা বীজের মতো। জিনটা বীজের মতো। বীজকে যেমন মাটি-পানি না দিলে সেটি গাছে পরিণত হবে না, তেমনি ক্যান্সারও পরিবেশের কারণে প্রভাবিত হয়। কোনো একটি জেনেটিক কারণ থাকে, তার সঙ্গে প্রবণতাটা বাড়ে। পরিবেশে কৃত্রিম খাবার, রঙ অর্থাৎ জীবনে কৃত্রিমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম উপাদানও বেড়েছে। এটাও ক্যান্সারের জীবাণুকে প্রভাবিত করে। এর প্রবণতাও বেড়ে গেছে।’

মানুষের ওজন আধিক্যের সঙ্গে ক্যান্সারের সুস্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে জানিয়ে ডা. লিয়াকত আলী আরো বলেন, ‘আমাদের জীবনাচার, কায়িক শ্রম কমে যাওয়ার কারণে ওজন আধিক্য সৃষ্টি হচ্ছে। জীবনাচারের পরিবর্তন ও দূষণের সঙ্গে যে কৃত্রিম উপাদানগুলো বেড়ে গেছে তাতে বহুগুণেই ক্যান্সারসহ দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগ বাড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা পুরুষের মধ্যে বেশি আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীর মধ্যে বেশি।’ 

জাতীয়ভাবে ক্যান্সারের কোনো রেজিস্ট্রি না থাকায় সারা দেশের চিত্র মূলত কেমন তা বলা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা গত বছর শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও হাসপাতাল, আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের তথ্য দিয়ে ক্যান্সার রেজিস্ট্রি তৈরির একটি পাইলট প্রজেক্ট করার চেষ্টা চালিয়েছি। সেখানে বিভিন্ন ক্যান্সার রোগী পেয়েছি। তবে তা কোনোটাই জাতীয় অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে না। আইএআরসি যে তথ্য দিয়েছে তা প্রাক্কলিত। এটা দিয়েও জাতীয় অবস্থা বোঝা যাবে না। জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতাল থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তাও তাদের রোগীদের। সমগ্র বাংলাদেশের তথ্য সেখানে নেই। আমরা পরিকল্পনা করেছি, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বড় পাঁচটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে আমরা রোগীদের তথ্য নিয়ে কাজ করব। এতে কিছুটা ভালো তথ্য পাওয়া যাবে। এছাড়া ক্যান্সারসহ সব অসংক্রামক রোগকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।’