শেয়ার বাজার

পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশ—অর্জনের উচ্ছ্বাসের সঙ্গে নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন
রূপপুরের আলো: শক্তির নতুন দিগন্ত, নাকি দায়িত্বের কঠিন পরীক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: শনিবার, ২ মে ২০২৬

রূপপুরের আলো: শক্তির নতুন দিগন্ত, নাকি দায়িত্বের কঠিন পরীক্ষা

বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় অগ্রগতি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ


বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বহু প্রতীক্ষিত এক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর মধ্য দিয়ে। এটি কেবল একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধন নয়; বরং একটি নতুন যুগে প্রবেশ। দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট, জ্বালানি নির্ভরতার অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান শিল্প ও নগর চাহিদার প্রেক্ষাপটে এই প্রকল্প বাংলাদেশের উন্নয়ন-অভিযাত্রায় একটি বড় বাঁকবদল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কিন্তু বড় অর্জনের সঙ্গে বড় প্রশ্নও আসে। পারমাণবিক শক্তি যেমন বিপুল সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়, তেমনি এটি বহন করে গভীর ঝুঁকি ও দায়িত্ব। তাই রূপপুরের আলোয় আলোকিত হওয়ার এই মুহূর্তে আমাদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আমরা কি এই শক্তিকে নিরাপদ ও টেকসইভাবে ব্যবস্থাপনার জন্য প্রস্তুত?

শক্তির রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এতদিন মূলত নির্ভর করেছে প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল ও আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ওঠানামা, সরবরাহ সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ—সব মিলিয়ে জ্বালানি খাত বারবার অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই বাস্তবতায় পারমাণবিক শক্তি একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে সামনে এসেছে।

রূপপুর প্রকল্প চালু হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো এমন একটি শক্তির উৎস পেল, যা তুলনামূলকভাবে কম জ্বালানি দিয়ে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। একই সঙ্গে এটি কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়ক, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

প্রযুক্তির সঙ্গে দায়িত্বের সমীকরণ

পারমাণবিক শক্তির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যই হলো—এটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এবং একই সঙ্গে অত্যন্ত সংবেদনশীল। এর ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের অবহেলা বা ত্রুটি ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ইতিহাসে চেরনোবিল দুর্ঘটনা এবং ফুকুশিমা দুর্ঘটনা এই বাস্তবতার নির্মম উদাহরণ।

এই দুটি ঘটনা শুধু প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং সেগুলো ছিল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, প্রস্তুতির অভাব এবং সংকট মোকাবিলায় ব্যর্থতার ফল। ফলে পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট—এখানে কোনো আপসের সুযোগ নেই। নিরাপত্তা হতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ দেশটি ঘনবসতিপূর্ণ, নদীবিধৌত এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা একটি অঞ্চল। তাই রূপপুর প্রকল্প পরিচালনায় আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ এবং তদারকি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: নীরব কিন্তু বড় চ্যালেঞ্জ

পারমাণবিক শক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তেজস্ক্রিয় বর্জ্য। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর যে বর্জ্য তৈরি হয়, তা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বিপজ্জনক থাকে। এই বর্জ্যের নিরাপদ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা একটি জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া।

বাংলাদেশকে এ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছাড়া এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।

মানবসম্পদ ও সক্ষমতা: ভবিষ্যতের বিনিয়োগ

রূপপুর প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; এটি একটি জ্ঞানভিত্তিক খাতের সূচনা। এই খাত টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন দক্ষ জনবল, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা। বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ধীরে ধীরে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।

এখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা এবং সরকারের মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পারমাণবিক শক্তি ব্যবস্থাপনা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি—এটি একদিনে অর্জন করা যায় না।

আস্থা ও জবাবদিহিতা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি

পারমাণবিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে জনআস্থা একটি বড় বিষয়। জনগণকে নিশ্চিত করতে হবে যে এই প্রকল্প নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো দুর্ঘটনা বা ত্রুটি গোপন না করে দ্রুত ও খোলামেলা তথ্য প্রকাশ করতে হবে।

স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, আন্তর্জাতিক তদারকি এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আস্থাহীনতা তৈরি হলে একটি ভালো প্রকল্পও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।

সামনে পথ

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্জন। এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এটি কোনো শেষ গন্তব্য নয়; বরং একটি দীর্ঘ যাত্রার শুরু।

এই যাত্রায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে—দায়িত্বশীলতা, সতর্কতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কারণ পারমাণবিক শক্তি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে সাফল্য যেমন বড়, ব্যর্থতাও তেমনি ভয়াবহ হতে পারে।


রূপপুরের আলো আজ আমাদের সম্ভাবনার কথা বলছে। কিন্তু সেই আলো টেকসই হবে কি না, তা নির্ভর করবে আমাদের সিদ্ধান্ত, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতার ওপর। উন্নয়নের এই শক্তিকে আমরা কতটা দায়িত্ব নিয়ে ব্যবহার করতে পারি—সেটিই এখন দেখার বিষয়।


দোষ কি ভাগ্যের, নাকি ক্ষমতাসীনদের অদক্ষতার?
অভিশাপ নয়, পরিকল্পিত ‘পদ্ধতিগত হত্যা’!

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৪ মে, ২০২৬

অভিশাপ নয়, পরিকল্পিত ‘পদ্ধতিগত হত্যা’!
মে ২০২৬। বাংলাদেশের বাতাস আজ শিশুদের কফিনের গন্ধে ভারী। হাম—যে রোগটিকে আমরা একসময় প্রায় নির্মূল হয়েছে বলে দাবি করেছিলাম—সেটিই আজ প্রতিশোধপরায়ণ ছায়ার মতো ফিরে এসে দেশের ঘরে ঘরে হানা দিচ্ছে। শত শত মায়ের কোলে আজ শূন্যতা, অসংখ্য পরিবার হারিয়েছে তাদের সন্তানকে। অথচ সমাজ ও প্রশাসনের একটি অংশ এই ভয়াবহ বিপর্যয়কে “আল্লাহর গজব” বা “ঈমানের পরীক্ষা” বলে চালিয়ে দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে। বিজ্ঞানের এই যুগে এমন ধোঁয়াশা কেবল অমানবিকই নয়, অপরাধও বটে। বাস্তবতা হচ্ছে—এই মৃত্যুমিছিল কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতা, আমলাতান্ত্রিক অদূরদর্শিতা এবং ভয়াবহ পদ্ধতিগত বিপর্যয়ের সরাসরি ফল।

এই সংকটের বীজ বপন করা হয়েছিল ২০২৪ ও ২০২৫ সালের প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার সময়ে। যখন দেশে বৃহৎ পরিসরে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কর্মসূচি চালুর কথা ছিল, তখন নীতিনির্ধারকেরা ব্যস্ত ছিলেন তথাকথিত ‘সংস্কার’ ও ‘স্বচ্ছতার’ বুলি আওড়াতে। বহু বছর ধরে সফলভাবে চলা ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থাকে হঠাৎ করেই ‘ওপেন টেন্ডার’-এর নামে স্থগিত করা হয়। জীবনরক্ষাকারী টিকা নিয়ে এই আমলাতান্ত্রিক পরীক্ষানিরীক্ষার ফলে ছয় মাসেরও বেশি সময় আমদানি কার্যত বন্ধ ছিল। এটি কেবল নীতিগত ভুল নয়; এটি ছিল একটি পদ্ধতিগত অপরাধ। সরবরাহ ব্যবস্থার সেই ছয় মাসের শূন্যতাই আজ আমাদের শিশুদের সম্পূর্ণ অরক্ষিত করে দিয়েছে।

দুঃখজনকভাবে, ওই সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বাজেট পুনর্বিন্যাসের অজুহাতে একের পর এক গণটিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে দেওয়া হয়। ‘মিতব্যয়িতা’র নামে জীবনরক্ষাকারী টিকাখাতে বরাদ্দ কমিয়ে ফেলা হয়। যখন মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেদের ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন করছিলেন, তখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসা কর্মকর্তারা রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। তারা ভুলে গিয়েছিলেন—টিকার বিলম্ব মানেই মৃত্যুর ঝুঁকি। ফলাফল হিসেবে প্রান্তিক ও দুর্গম অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক শিশু কোনো ধরনের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ছাড়াই বেড়ে উঠেছে। এখন যখন সংক্রমণ চূড়ায় পৌঁছেছে, তখন আমরা দেখছি—জেলা হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ নেই, ভেন্টিলেটর থাকলেও চালানোর লোক নেই, আর অক্সিজেনের অভাবে শিশুরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।

আজ মৃতের সংখ্যা ৫০০ এর অধিক । এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি ভবিষ্যৎ। প্রশ্ন হচ্ছে—যেসব আমলা মাসের পর মাস ফাইল আটকে রেখেছিলেন, তারা কি এই মৃত্যুর দায় নেবেন? যারা ‘বাজার প্রতিযোগিতা’র নামে বৈশ্বিক টিকা সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছিলেন, তারা কি জবাবদিহির মুখোমুখি হবেন? এটা এখন স্পষ্ট—অযোগ্য মানুষের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা গেলে তার মূল্য সাধারণ মানুষকে রক্ত দিয়ে পরিশোধ করতে হয়। এটি কোনো প্রাকৃতিক মহামারি নয়; এটি মানুষের তৈরি বিপর্যয়—যাকে যথার্থভাবেই বলা যায় ‘প্রশাসনিক হত্যা’।

তদন্ত কমিটি গঠন কিংবা জরুরি তহবিল ঘোষণায় মৃত শিশুরা আর ফিরে আসবে না। এখন সময় পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহির। যারা সংস্কারের নামে শিশুদের জীবন নিয়ে রুশিয়ান রুলেট খেলেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনতেই হবে। উন্নয়নের যত গল্পই শোনানো হোক না কেন, এই লাশের পাহাড় কোনোভাবেই আড়াল করা যাবে না। আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই না, যেখানে আমলাতন্ত্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন নিয়ে জুয়া খেলবে। প্রতিটি শোকাহত পরিবারের আর্তনাদ আজ ন্যায়বিচার দাবি করছে। আমাদের লড়াই এখন একটাই—যেন আর কোনো বাবাকে প্রতিরোধযোগ্য রোগে সন্তানের জানাজায় দাঁড়াতে না হয়।


-মোকাররম হোসেন শুভ
সাংবাদিক ও কলামিস্ট